বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘জোট’ শব্দটির মূল্য অনেক বেশি। তবে, এখানে নীতির চেয়ে ‘নীতিহীন’ জোটই অনেক সময় টিকে থাকে বেশি দিন। আর এ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
এক সময়ের ৯০-এর দশকে বিএনপি-জামায়াত জোট গঠন করে ক্ষমতার অংশীদার হয়। তখন জামায়াত ছিল “গুরুত্বপূর্ণ শরিক”, তাদের নেতারা মন্ত্রীত্ব পেয়েছিলেন, নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও ছিল প্রভাব। কিন্তু সময় বদলেছে। আজ সেই জামায়াতই কখনো নিবন্ধনহীন অছায়া দল, কখনো জঙ্গি সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে চিত্রিত হচ্ছে! রাজনৈতিক অবস্থান বা সুবিধা পাওয়ার উপর নির্ভর করে।
জোটে থাকলে ‘সম্মানিত শরিক’…
১৯৯০-৯১ তে আওয়ামী লীগের সাথে রাজপথে স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে একই মঞ্চ ভাগাভাগি করে জামায়াতে ইসলামী অতঃপর আবারো ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের জোট ক্ষমতায় আসে। তখন জামায়াতকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় শরিক করেও বড় কোনো বিতর্ক সৃষ্টি হয়নি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে মন্ত্রীসভায় জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদদের মতো নেতা মন্ত্রিত্ব পান। অথচ আওয়ামী অপশাসনে এই দুইজনই পরে যুদ্ধাপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ফাঁসিতে ঝুলেছেন।
প্রশ্ন উঠে, যদি এরা যুদ্ধাপরাধী হন, তবে তারা কিভাবে এতদিন রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করলেন? রাষ্ট্রযন্ত্র কি তখন ব্যর্থ ছিল, না কি তখন ‘জোটের প্রয়োজন’ ছিল বলে চোখ বন্ধ ছিল?
জোটে না থাকলেই ‘জঙ্গি সংশ্লিষ্ট’!
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় জামায়াতে ইসলামকে আর বড় কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রকাশ্য জোটে দেখা যায় না। বিশ্লেষকদের মতে, কারো জোটের অংশীদার না’হয়ে নিজেরাই একটি বড় দল হিসেবে গড়ে উঠেছে জামায়াত। কিন্তু এখন আবার সাবেক জোট সঙ্গীরাই জামায়াতকে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা ও ৭১ এর রাজাকার সহ বিভিন্ন কুরুচিপূর্ণ তকমা দিচ্ছেন। তাই প্রশ্ন উঠছে, জামায়াতে ইসলামী কি তাহলে, জোট সঙ্গী হলেই সঙ্গী, না’হলেই জঙ্গি?
রাজনৈতিক সুবিধাবাদ, নাকি নিরাপত্তার প্রশ্ন?
যখন জামায়াতের সাথে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ থাকে না, তখন তাদের ধর্মীয় ভাবাদর্শ, রাজনীতির ধরন, অতীত ইতিহাস-সব কিছুই ‘ঝুঁকি’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। কিন্তু যখন জোটের প্রয়োজন পড়ে, তখন তারা হয়ে ওঠে ‘সম্ভাব্য শরিক’, ‘আস্থাভাজন’ ও আদর্শিক রাজনৈতিক দল।
এ ধরণের দ্বৈত নীতি রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কাম্য নয়।
শেষ কথা: নীতি না সুবিধা-কোনটা চাই?
একটা দল যদি সত্যিই জঙ্গি সংশ্লিষ্ট হয়, তাহলে তা জোটে থাকলেও বিপজ্জনক, আর না থাকলেও। অন্যদিকে, শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণে কোনো দলকে কখনো ‘শরিক’, কখনো ‘শত্রু’ বানানো হলে সেটা রাষ্ট্রীয় নীতিনৈতিকতা ও গণতন্ত্রের জন্য ভয়াবহ বার্তা দেয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন প্রয়োজন সত্যিকার অর্থে নীতিনির্ভর জোট ও অবস্থান। সুবিধাবাদী জোট নয়, বরং নীতির প্রশ্নে আপসহীন রাজনৈতিক সংস্কৃতিই পারে গণতন্ত্রকে বাঁচাতে।
৩০.০৯.২০২৫ইং
লিখক: মোঃ মাইন উদ্দিন (সাগর)
সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক ইনফো বাংলা।
সদস্য, উইন্ডো জার্নালিজম একাডেমি, ঢাকা।